মহাবিশ্ব সম্পর্কে ১০০ গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও তার বিস্তারিত উত্তর

মহাবিশ্ব এক অনন্ত বিস্ময়। এর সৃষ্টি, বিবর্তন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে মানুষের কৌতুহলের শেষ নেই। আপনার জানার সুবিধার্থে মহাবিশ্ব সম্পর্কে ১০০টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এবং সেগুলোর  উত্তর নিচে দেওয়া হলো।

১. মহাবিশ্বের সৃষ্টি ও প্রাথমিক অবস্থা

১. মহাবিশ্ব কীভাবে সৃষ্টি হয়েছিল?

উত্তর: প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন (১,৩৮০ কোটি) বছর আগে একটি অতি ক্ষুদ্র, অতি ঘন এবং অসীম উত্তপ্ত বিন্দু থেকে এক মহাবিস্ফোরণের মাধ্যমে মহাবিশ্বের সৃষ্টি হয়েছিল। এই তত্ত্বটিকে বলা হয় বিগ ব্যাং (Big Bang)। বিগ ব্যাং কোনো সাধারণ বিস্ফোরণ ছিল না, এটি ছিল স্থান (Space) এবং সময়ের (Time) আকস্মিক প্রসারণ।

২. বিগ ব্যাং তত্ত্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণ কী?

উত্তর: এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশন (CMBR)। এটি হলো বিগ ব্যাং-এর পর অবশিষ্ট থাকা প্রাচীনতম আলোর দুর্বল আভা, যা পুরো মহাবিশ্বে ছড়িয়ে আছে। এছাড়া দূরবর্তী গ্যালাক্সিগুলোর একে অপরের থেকে দূরে সরে যাওয়া (মহাবিশ্বের প্রসারণ) এই তত্ত্বকে সমর্থন করে।

৩. বিগ ব্যাং-এর আগে কী ছিল?

উত্তর: আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের মতে, বিগ ব্যাং-এর মাধ্যমেই 'স্থান' (Space) এবং 'সময়' (Time)-এর সৃষ্টি হয়েছে। তাই বিগ ব্যাং-এর "আগে" কী ছিল—এই প্রশ্নটির বৈজ্ঞানিক কোনো ভিত্তি নেই, কারণ তখন সময়ের কোনো অস্তিত্বই ছিল না।

৪. মহাবিশ্বের বয়স কত?

উত্তর: প্লাঙ্ক স্যাটেলাইট এবং অন্যান্য মহাজাগতিক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, মহাবিশ্বের বর্তমান বয়স প্রায় ১৩.৭৮৭ বিলিয়ন বছর (সামান্য কম-বেশি হতে পারে)।

৫. মহাজাগতিক স্ফীতি বা কসমিক ইনফ্লেশন (Cosmic Inflation) কী?

উত্তর: বিগ ব্যাং-এর ঠিক পর পরই (এক সেকেন্ডের ক্ষুদ্র ভগ্নাংশের মধ্যে) মহাবিশ্ব অত্যন্ত দ্রুত গতিতে এবং বিশাল আকারে প্রসারিত হয়েছিল। এই অতি-প্রসারণের ঘটনাকেই কসমিক ইনফ্লেশন বলা হয়।

৬. সিংগুলারিটি (Singularity) কী?

উত্তর: বিগ ব্যাং-এর ঠিক পূর্ব মুহূর্তে মহাবিশ্বের সমস্ত পদার্থ এবং শক্তি যেখানে একটি অসীম ঘন এবং শূন্য আয়তনের বিন্দুতে পুঞ্জীভূত ছিল, সেই অবস্থাকে সিংগুলারিটি বা এককত্ব বলা হয়। ব্ল্যাক হোলের কেন্দ্রেও এমন সিংগুলারিটি থাকে বলে ধারণা করা হয়।

৭. মহাবিশ্বের আদিমতম উপাদান কী কী ছিল?

উত্তর: বিগ ব্যাং-এর পর প্রথম তৈরি হওয়া মৌলিক উপাদানগুলো ছিল মূলত হাইড্রোজেন (প্রায় ৭৫%) এবং হিলিয়াম (常 ২৫%), সাথে অত্যন্ত সামান্য পরিমাণে লিথিয়াম।

৮. মহাবিশ্বের আকার কত বড়?

উত্তর: আমরা পৃথিবী থেকে যতটুকু মহাবিশ্ব দেখতে পাই, তাকে বলা হয় পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্ব (Observable Universe)। এর ব্যাস প্রায় ৯৩ বিলিয়ন আলোকবর্ষ। তবে সমগ্র মহাবিশ্বের আকার কত বড়, তা আমাদের অজানা; এটি অসীমও হতে পারে।

৯. মহাবিশ্বের জ্যামিতিক আকার কেমন?

উত্তর: মহাজাগতিক ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশনের পরিমাপ অনুযায়ী, আমাদের মহাবিশ্ব জ্যামিতিকভাবে সমতল (Flat)। এর অর্থ হলো, মহাবিশ্বে দুটি সমান্তরাল আলোক রশ্মি চিরকাল সমান্তরালই থাকবে, কখনো একে অপরকে ছেদ করবে না।

১০. মহাবিশ্বের কি কোনো কেন্দ্র বা সীমানা আছে?

উত্তর: না, মহাবিশ্বের কোনো নির্দিষ্ট কেন্দ্র বা সীমানা নেই। বিগ ব্যাং কোনো একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে হয়নি, বরং স্থান নিজেই প্রসারিত হচ্ছে। ফলে মহাবিশ্বের প্রতিটি বিন্দুই নিজেকে কেন্দ্র বলে মনে করতে পারে।

২. গ্যালাক্সি বা ছায়াপথ

১১. গ্যালাক্সি বা ছায়াপথ কী?

উত্তর: কোটি কোটি তারা বা নক্ষত্র, গ্যাস, ধূলিকণা এবং ডার্ক ম্যাটারের এক বিশাল সমষ্টি যা মহাকর্ষ বলের মাধ্যমে একসাথে আবদ্ধ থাকে, তাকে গ্যালাক্সি বা ছায়াপথ বলে।

১২. আমাদের গ্যালাক্সির নাম কী এবং এটি দেখতে কেমন?

উত্তর: আমাদের গ্যালাক্সির নাম মিল্কি ওয়ে (Milky Way) বা আকাশগঙ্গা। এটি একটি সর্পিল বা স্পাইরাল (Spiral) গ্যালাক্সি

১৩. মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সিতে কত নক্ষত্র আছে?

উত্তর: ধারণা করা হয়, মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সিতে প্রায় ১০০ থেকে ৪০০ বিলিয়ন (১০,০০০ থেকে ৪০,০০০ কোটি) নক্ষত্র বা তারা রয়েছে।

১৪. আমাদের সবচেয়ে কাছের বড় গ্যালাক্সি কোনটি?

উত্তর: আমাদের সবচেয়ে কাছের বড় সর্পিল গ্যালাক্সি হলো অ্যান্ড্রোমিডা (Andromeda Galaxy)। এটি পৃথিবী থেকে প্রায় ২৫ লক্ষ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত।

১৫. গ্যালাক্সি কত প্রকার ও কী কী?

উত্তর: আকৃতি অনুযায়ী গ্যালাক্সি প্রধানত চার প্রকার:

  • সর্পিল (Spiral)

  • উপবৃত্তাকার (Elliptical)

  • লেন্স আকৃতির (Lenticular)

  • অনিয়মিত (Irregular)

১৬. অ্যান্ড্রোমিডা এবং মিল্কি ওয়ের মধ্যে সংঘর্ষ হলে কী হবে?

উত্তর: প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন বছর পর মিল্কি ওয়ে এবং অ্যান্ড্রোমিডা গ্যালাক্সির মধ্যে সংঘর্ষ ঘটবে। তবে নক্ষত্রগুলোর মধ্যকার দূরত্ব অনেক বেশি হওয়ায় নক্ষত্রে-নক্ষত্রে সরাসরি সংঘর্ষের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। দুটি মিলে একটি বিশাল উপবৃত্তাকার গ্যালাক্সি তৈরি হবে, যার নাম দেওয়া হয়েছে মিল্কোমিডা (Milkdromeda)

১৭. গ্যালাক্সি ক্লাস্টার (Galaxy Cluster) কী?

উত্তর: মহাকর্ষের টানে যখন অনেকগুলো গ্যালাক্সি একত্রে একটি দল বা ঝাঁক তৈরি করে, তাকে গ্যালাক্সি ক্লাস্টার বলে। আমাদের মিল্কি ওয়ে 'লোকাল গ্রুপ' (Local Group) নামক একটি ক্লাস্টারের অংশ।

১৮. কোয়াসার (Quasar) কী?

উত্তর: কোয়াসার হলো মহাবিশ্বের অন্যতম উজ্জ্বল এবং দূরবর্তী বস্তু। এগুলো আসলে অতিভরের ব্ল্যাক হোল সমৃদ্ধ সক্রিয় গ্যালাক্সির কেন্দ্র (Active Galactic Nuclei), যা থেকে প্রচুর পরিমাণে শক্তি ও আলো নির্গত হয়।

১৯. হাবল ডিপ ফিল্ড (Hubble Deep Field) কী?

উত্তর: হাবল স্পেস টেলিস্কোপ দ্বারা আকাশের একটি আপাতদৃষ্টিতে অন্ধকার ও শূন্য অংশের দীর্ঘ সময় ধরে নেওয়া ছবি। এই ছবিতে হাজার হাজার অত্যন্ত দূরের এবং প্রাচীন গ্যালাক্সির সন্ধান পাওয়া যায়, যা মহাবিশ্বের আদি রূপ বুঝতে সাহায্য করেছে।

২০. গ্যালাক্সিগুলো কেন একে অপরের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে?

উত্তর: গ্যালাক্সিগুলো মহাকাশের মধ্য দিয়ে হেঁটে দূরে সরছে না, বরং গ্যালাক্সিগুলোর মাঝখানের স্থান (Space) নিজেই প্রসারিত হচ্ছে। বেলুন ফোলালে যেমন তার গায়ের বিন্দুগুলো দূরে সরে যায়, এটিও ঠিক তেমন।

৩. নক্ষত্র এবং তাদের জীবনচক্র

২১. নক্ষত্র বা তারা কী?

উত্তর: নক্ষত্র হলো গ্যাস ও প্লাজমার তৈরি এক বিশাল গোলক, যা নিজের কেন্দ্রে ঘটা নিউক্লিয়ার ফিউশন (নিউক্লীয় সংযোজন) বিক্রিয়ার মাধ্যমে প্রচুর আলো এবং তাপ উৎপন্ন করে।

২২. নিউক্লিয়ার ফিউশন (Nuclear Fusion) কী?

উত্তর: এটি এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে তীব্র চাপ ও তাপে নক্ষত্রের কেন্দ্রে হাইড্রোজেন পরমাণু যুক্ত হয়ে হিলিয়াম পরমাণু তৈরি করে। এই প্রক্রিয়ায় বিশাল পরিমাণ শক্তি ও আলো উৎপন্ন হয়, যা নক্ষত্রকে বাঁচিয়ে রাখে।

২৩. প্রোটোস্টার (Protostar) কী?

উত্তর: নক্ষত্র তৈরির প্রাথমিক অবস্থাকে প্রোটোস্টার বলে। মহাজাগতিক গ্যাস ও ধূলিকণার মেঘ (নেবুলা) যখন মহাকর্ষের টানে সংকুচিত হতে শুরু করে কিন্তু কেন্দ্রে তখনও নিউক্লিয়ার ফিউশন শুরু হয় না, সেই অবস্থাই হলো প্রোটোস্টার।

২৪. নেবুলা বা নীহারিকা কী?

উত্তর: মহাকাশে হাইড্রোজেন, হিলিয়াম এবং ধূলিকণার বিশাল মেঘকে নেবুলা বলে। একে নক্ষত্রের নার্সারি বা জন্মস্থানও বলা হয়, কারণ এখানেই নতুন নতুন নক্ষত্রের জন্ম হয়।

২৫. নক্ষত্রের মৃত্যু কীভাবে হয়?

উত্তর: নক্ষত্রের কেন্দ্রের হাইড্রোজেন জ্বালানি শেষ হয়ে গেলে এর মৃত্যু প্রক্রিয়া শুরু হয়। ছোট নক্ষত্ররা হোয়াইট ডোয়ার্ফে পরিণত হয়, আর বড় নক্ষত্ররা সুপারনোভা বিস্ফোরণের মাধ্যমে ধ্বংস হয়ে ব্ল্যাক হোল বা নিউট্রন স্টারে পরিণত হয়।

২৬. সুপারনোভা (Supernova) কী?

উত্তর: একটি বিশাল ভরের নক্ষত্রের জীবনের শেষ প্রান্তে যে অত্যন্ত শক্তিশালী এবং উজ্জ্বল মহাবিস্ফোরণ ঘটে, তাকে সুপারনোভা বলে। এই বিস্ফোরণের ফলে নক্ষত্রের বাইরের অংশ মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে।

২৭. হোয়াইট ডোয়ার্ফ বা শ্বেত বামন (White Dwarf) কী?

উত্তর: আমাদের সূর্যের মতো মাঝারি বা ছোট আকারের নক্ষত্রগুলোর জ্বালানি শেষ হয়ে গেলে তারা তাদের বাইরের স্তর মহাকাশে ভাসিয়ে দেয়। অবশিষ্ট অত্যন্ত ঘন এবং উত্তপ্ত কেন্দ্রটিকে হোয়াইট ডোয়ার্ফ বলে।

২৮. নিউট্রন স্টার (Neutron Star) কী?

উত্তর: একটি বিশাল নক্ষত্রের সুপারনোভা বিস্ফোরণের পর যদি তার কেন্দ্রটি ভেঙে পড়ে এবং এর ভর যদি সূর্যের ভরের ১.৪ থেকে ৩ গুণের মধ্যে হয়, তবে ইলেকট্রন ও প্রোটন মিলে নিউট্রনে পরিণত হয়। এই অত্যন্ত ঘন নক্ষত্রকে নিউট্রন স্টার বলে। এর এক চামচ পদার্থের ওজন পৃথিবীতে কয়েক বিলিয়ন টন হতে পারে।

২৯. পালসার (Pulsar) কী?

উত্তর: পালসার হলো অত্যন্ত দ্রুত ঘূর্ণনশীল নিউট্রন স্টার, যা তার চৌম্বকীয় মেরু থেকে নির্দিষ্ট সময় পর পর রেডিও তরঙ্গের তীব্র রশ্মি নির্গত করে। দূর থেকে একে মহাজাগতিক বাতিঘরের (Lighthouse) মতো মনে হয়।

৩০. আমাদের সূর্য কতদিন বাঁচবে?

উত্তর: সূর্যের বর্তমান বয়স প্রায় ৪.৬ বিলিয়ন বছর। এর কেন্দ্রে যে পরিমাণ হাইড্রোজেন আছে, তাতে এটি আরও প্রায় ৫ বিলিয়ন বছর আলো ও তাপ দিতে পারবে।

৪. ব্ল্যাক হোল ও স্পেস-টাইম

৩১. ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণগহ্বর কী?

উত্তর: ব্ল্যাক হোল হলো মহাকাশের এমন একটি স্থান যেখানে মহাকর্ষীয় বল এতটাই শক্তিশালী যে আলোসহ কোনো কিছুই এর ভেতর থেকে বের হতে পারে না। বিশাল কোনো নক্ষত্রের মৃত্যুর পর এর পতনের ফলে ব্ল্যাক হোল তৈরি হয়।

৩২. ইভেন্ট হরাইজন বা ঘটনা দিগন্ত (Event Horizon) কী?

উত্তর: ব্ল্যাক হোলের চারপাশের অদৃশ্য সীমানাকে ইভেন্ট হরাইজন বলে। কোনো বস্তু বা আলো একবার এই সীমানা অতিক্রম করলে তা আর কখনো ফিরে আসতে পারে না। একে 'পয়েন্ট অব নো রিটার্ন' বলা হয়।

৩৩. স্পেস-টাইম বা স্থান-কাল কী?

উত্তর: আলবার্ট আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্ব অনুযায়ী, স্থান (তিনটি মাত্রা) এবং সময় (চতুর্থ মাত্রা) আলাদা কিছু নয়, বরং তারা একত্রে বোনা একটি চাদরের মতো, যাকে স্পেস-টাইম বা স্থান-কাল বলা হয়।

৩৪. মহাকর্ষ (Gravity) আসলে কী?

উত্তর: আইনস্টাইনের মতে, মহাকর্ষ কোনো আকর্ষণ বল নয়। কোনো ভারী বস্তু (যেমন সূর্য বা পৃথিবী) স্পেস-টাইমের চাদরের ওপর বসলে সেখানে একটি বাঁক বা বক্রতার সৃষ্টি হয়। এই বক্রতার কারণেই কম ভরের বস্তুগুলো ভারী বস্তুর দিকে ঝুঁকে পড়ে, যা আমরা মহাকর্ষ হিসেবে অনুভব করি।

৩৫. মহাকর্ষীয় তরঙ্গ (Gravitational Waves) কী?

উত্তর: দুটি ব্ল্যাক হোল বা নিউট্রন স্টারের মতো অতি ভারী বস্তুর সংঘর্ষের ফলে স্পেস-টাইমের চাদরে যে তরঙ্গের সৃষ্টি হয় এবং যা আলোর গতিতে মহাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে, তাকে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ বলে। ২০১৫ সালে এটি প্রথম সরাসরি শনাক্ত করা হয়।

৩৬. ওয়ার্মহোল (Wormhole) কী?

উত্তর: এটি স্পেস-টাইমের মধ্য দিয়ে একটি তাত্ত্বিক সুড়ঙ্গ বা সংক্ষিপ্ত পথ (Shortcut), যা মহাবিশ্বের দুটি অত্যন্ত দূরবর্তী স্থানকে সরাসরি যুক্ত করতে পারে। তবে বাস্তবে এর কোনো অস্তিত্ব এখনও পাওয়া যায়নি।

৩৭. টাইম ডাইলেশন বা সময়ের প্রসারণ কী?

উত্তর: আইনস্টাইনের তত্ত্ব অনুযায়ী, তীব্র মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রে অথবা আলোর গতির কাছাকাছি চললে সময় ধীর হয়ে যায়। অর্থাৎ, পৃথিবীতে থাকা একজন মানুষের চেয়ে ব্ল্যাক হোলের কাছাকাছি থাকা মানুষের সময় অনেক ধীরে কাটবে।

৩৮. স্প্যাগেটিফিকেশন (Spaghettification) কী?

উত্তর: কেউ যদি ব্ল্যাক হোলে পড়ে যায়, তবে তার পায়ের দিকের মহাকর্ষ বল মাথার দিকের চেয়ে অনেক বেশি হবে। ফলে তীব্র টানে শরীরটি লম্বা সুতার বা স্প্যাগেটির মতো টেনে লম্বা হয়ে যাবে। এই প্রক্রিয়াকে স্প্যাগেটিফিকেশন বলে।

৩৯. সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল (Supermassive Black Hole) কী?

উত্তর: এগুলো হলো লক্ষ লক্ষ থেকে কোটি কোটি সূর্যের সমান ভরের দানবীয় ব্ল্যাক হোল, যা সাধারণত আমাদের মিল্কি ওয়েসহ প্রায় প্রতিটি গ্যালাক্সির কেন্দ্রে অবস্থিত থাকে। মিল্কি ওয়ের কেন্দ্রের ব্ল্যাক হোলটির নাম সাজিট্যারিয়াস এ (Sagittarius A)।

৪০. হকিং রেডিয়েশন (Hawking Radiation) কী?

উত্তর: বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং আবিষ্কার করেন যে, কোয়ান্টাম প্রভাবের কারণে ব্ল্যাক হোল সম্পূর্ণ কালো নয়, এটি থেকে খুব সামান্য পরিমাণে বিকিরণ বা কণা নির্গত হয়। একে হকিং রেডিয়েশন বলে। এর ফলে কোটি কোটি বছর পর ব্ল্যাক হোল বাষ্পীভূত হয়ে বিলীন হয়ে যেতে পারে।

৫. সৌরজগৎ ও গ্রহসমূহ

৪১. সৌরজগৎ কীভাবে গঠিত হয়েছিল?

উত্তর: প্রায় ৪.৬ বিলিয়ন বছর আগে একটি বিশাল আণবিক গ্যাস ও ধূলিকণার মেঘের (Solar Nebula) মহাকর্ষীয় পতনের ফলে সৌরজগতের সৃষ্টি হয়েছিল। কেন্দ্রের অংশটি সূর্য এবং চারপাশের ধূলিকণা জমাট বেঁধে গ্রহগুলো তৈরি হয়।

৪২. সৌরজগতের বৃহত্তম এবং ক্ষুদ্রতম গ্রহ কোনটি?

উত্তর: সৌরজগতের বৃহত্তম গ্রহ হলো বৃহস্পতি (Jupiter) এবং ক্ষুদ্রতম গ্রহ হলো বুধ (Mercury)

৪৩. শুক্র গ্রহ কেন বুধ গ্রহের চেয়ে বেশি উত্তপ্ত, যদিও বুধ সূর্যের সবচেয়ে কাছে?

উত্তর: শুক্র গ্রহের বায়ুমণ্ডল অত্যন্ত ঘন এবং এটি প্রায় ৯৬% কার্বন ডাই-অক্সাইডে পূর্ণ। এই ঘন বায়ুমণ্ডল সূর্যের তাপকে ভেতরে আটকে ফেলে তীব্র গ্রিনহাউস প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে, যার ফলে শুক্রের তাপমাত্রা বুধের চেয়েও বেশি (প্রায় ৪৬৫°C) হয়।

৪৪. প্লুটোকে কেন আর গ্রহ বলা হয় না?

উত্তর: ২০০৬ সালে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিয়ন (IAU) গ্রহের নতুন সংজ্ঞা নির্ধারণ করে। সংজ্ঞা অনুযায়ী একটি গ্রহকে তার কক্ষপথের চারপাশের অন্য সব ছোট বস্তু বা ধ্বংসাবশেষ পরিষ্কার রাখতে হবে। প্লুটো তার কক্ষপথের অন্যান্য বরফ খণ্ডকে সরিয়ে দিতে না পারায় তাকে বামন গ্রহ (Dwarf Planet) হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়।

৪৫. গ্রহাণু বেল্ট (Asteroid Belt) কী এবং এটি কোথায় অবস্থিত?

উত্তর: মঙ্গল এবং বৃহস্পতি গ্রহের কক্ষপথের মধ্যবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত লক্ষ লক্ষ পাথুরে বস্তুর এক বিশাল বলয়কে গ্রহাণু বেল্ট বলে। এগুলো সৌরজগৎ তৈরির সময় অবশিষ্ট রয়ে যাওয়া পাথুরে উপাদান।

৪৬. কাইপার বেল্ট (Kuiper Belt) কী?

উত্তর: নেপচুন গ্রহের কক্ষপথের বাইরে (সৌরজগতের দূরবর্তী প্রান্তে) অবস্থিত বরফ ও পাথুরে বস্তুর একটি বিশাল বলয়, যেখানে প্লুটোসহ অনেক বামন গ্রহ এবং ধূমকেতুর উৎপত্তি স্থল রয়েছে।

৪৭. উর্ট মেঘ (Oort Cloud) কী?

উত্তর: এটি সৌরজগতের একেবারে শেষ সীমানায় অবস্থিত ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন বরফ খণ্ডের একটি তাত্ত্বিক গোলাকার মেঘ। এখান থেকেই দীর্ঘমেয়াদী ধূমকেতুগুলো সূর্যের দিকে ছুটে আসে।

৪৮. উপগ্রহ বা চাঁদ কী?

উত্তর: কোনো প্রাকৃতিক বস্তু যখন মহাকর্ষ বলের কারণে কোনো গ্রহের চারদিকে প্রদক্ষিণ করে, তখন তাকে ওই গ্রহের উপগ্রহ বা চাঁদ বলে। যেমন পৃথিবীর চাঁদ।

৪৯. সৌরজগতের কোন গ্রহের সবচেয়ে বেশি চাঁদ আছে?

উত্তর: সাম্প্রতিক আবিষ্কার অনুযায়ী, শনি (Saturn) গ্রহের সবচেয়ে বেশি চাঁদ রয়েছে (১৪৬টিরও বেশি)। দ্বিতীয় অবস্থানে আছে বৃহস্পতি।

৫০. এক্সোপ্ল্যানেট (Exoplanet) বা বহির্গ্রহ কী?

উত্তর: আমাদের সৌরজগতের বাইরে অন্য কোনো নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে আবর্তিত গ্রহগুলোকে এক্সোপ্ল্যানেট বা বহির্গ্রহ বলা হয়। এ পর্যন্ত হাজার হাজার এমন গ্রহ আবিষ্কৃত হয়েছে।

৬. ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি

৫১. ডার্ক ম্যাটার (Dark Matter) কী?

উত্তর: ডার্ক ম্যাটার হলো এক রহস্যময় অদৃশ্য পদার্থ, যা আলো বা অন্য কোনো তড়িৎ-চৌম্বকীয় বিকিরণ নির্গত, শোষণ বা প্রতিফলন করে না। তবে এর শক্তিশালী মহাকর্ষীয় প্রভাবের কারণে গ্যালাক্সিগুলো ছিটকে না গিয়ে একত্রে ধরে থাকে।

৫২. ডার্ক এনার্জি (Dark Energy) কী?

উত্তর: ডার্ক এনার্জি হলো এমন এক অজানা রহস্যময় শক্তি যা পুরো মহাবিশ্বে ছড়িয়ে আছে এবং মহাবিশ্বের প্রসারণের গতিকে প্রতিনিয়ত ত্বরান্বিত বা দ্রুততর করছে। এটি মহাকর্ষের বিপরীত হিসেবে কাজ করে।

৫৩. মহাবিশ্বের উপাদানের অনুপাত কেমন?

উত্তর: আমরা মহাবিশ্বে যা কিছু দেখতে পাই (নক্ষত্র, গ্রহ, গ্যাস, আমাদের শরীর)—তা মহাবিশ্বের মাত্র ৫%। বাকি ২৭% ডার্ক ম্যাটার এবং প্রায় ৬৮% ডার্ক এনার্জি দিয়ে গঠিত।

৫৪. ডার্ক ম্যাটার যদি দেখাই না যায়, তবে এর অস্তিত্ব আমরা জানলাম কীভাবে?

উত্তর: গ্যালাক্সিগুলোর ঘূর্ণন গতি পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, ভেতরের দৃশ্যমান পদার্থের চেয়ে গ্যালাক্সিগুলো অনেক দ্রুত ঘুরছে। পর্যাপ্ত মহাকর্ষ বল না থাকলে তারা ভেঙে যাওয়ার কথা ছিল। এই অতিরিক্ত মহাকর্ষের উৎস হিসেবেই ডার্ক ম্যাটারের অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়।

৫৫. ডার্ক এনার্জি কে আবিষ্কার করেন?

উত্তর: ১৯৯৮ সালে দুটি বিজ্ঞানী দল দূরবর্তী সুপারনোভা পর্যবেক্ষণ করে আবিষ্কার করেন যে মহাবিশ্বের প্রসারণের গতি কমছে না, বরং দিন দিন বাড়ছে। এই আবিষ্কারের জন্য ২০১১ সালে তাদের নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়।

৭. কসমোলজি ও মহাজাগতিক পরিমাপ

৫৬. আলোকবর্ষ (Light Year) কী?

উত্তর: আলো এক বছরে শূন্য মাধ্যমে যতদূর দূরত্ব অতিক্রম করে, তাকে এক আলোকবর্ষ বলে। এটি দূরত্বের একক, সময়ের নয়। এক আলোকবর্ষ সমান প্রায় ৯.৪৬ ট্রিলিয়ন কিলোমিটার ($9.46 \times 10^{12}$ কিমি)।

৫৭. আলোর গতি কত?

উত্তর: শূন্য মাধ্যমে আলোর গতি প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩ লক্ষ কিলোমিটার ($299,792$ কিমি/সেকেন্ড)। মহাবিশ্বে এর চেয়ে দ্রুত কোনো কিছুই চলতে পারে না।

৫৮. পারসেক (Parsec) কী?

উত্তর: জ্যোতির্বিদ্যায় দূরত্বের আরেকটি বড় একক হলো পারসেক। ১ পারসেক সমান প্রায় ৩.২৬ আলোকবর্ষ

৫৯. অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিট (AU) কী?

উত্তর: সূর্য থেকে পৃথিবীর গড় দূরত্বকে (প্রায় ১৫ কোটি কিলোমিটার) ১ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিট বা ১ AU বলা হয়। এটি সৌরজগতের ভেতরের দূরত্ব মাপতে ব্যবহৃত হয়।

৬০. রেডশিফট (Redshift) বা লোহিত অপসরণ কী?

উত্তর: কোনো আলোক উৎস (যেমন গ্যালাক্সি) যখন আমাদের থেকে দূরে সরে যায়, তখন তার থেকে আসা আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য প্রসারিত হয়ে লাল রঙের দিকে চলে যায়। একে রেডশিফট বলে। এর মাধ্যমেই মহাবিশ্বের প্রসারণ প্রমাণিত হয়েছে।

৮. স্থান ও মহাকাশ ভ্রমণ

৬১. মহাকাশ (Space) কোথা থেকে শুরু হয়?

উত্তর: সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার উচ্চতায় একটি কাল্পনিক রেখা রয়েছে, যাকে কার্মান রেখা (Kármán Line) বলা হয়। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী এখান থেকেই মহাকাশের শুরু।

৬২. মহাশূন্য কি সম্পূর্ণ শূন্য বা খালি?

উত্তর: না, মহাশূন্য পুরোপুরি খালি নয়। যদিও এটি একটি পরম শূন্যতার (Vacuum) কাছাকাছি, তবুও প্রতি ঘনমিটারে খুব সামান্য হাইড্রোজেন পরমাণু, মহাজাগতিক রশ্মি, ধূলিকণা এবং রেডিয়েশন থাকে।

৬৩. মহাকাশে কোনো শব্দ শোনা যায় না কেন?

উত্তর: শব্দ চলাচলের জন্য বাতাস বা কোনো মাধ্যমের প্রয়োজন হয়। মহাশূন্যে কোনো বায়ুমণ্ডল বা মাধ্যম না থাকায় সেখানে শব্দ তরঙ্গ ভ্রমণ করতে পারে না, তাই মহাকাশ সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ।

৬৪. আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন (ISS) কী?

উত্তর: এটি পৃথিবীর কক্ষপথে ঘূর্ণনশীল একটি বিশাল কৃত্রিম উপগ্রহ ও গবেষণাগার, যেখানে বিভিন্ন দেশের নভোচারীরা মাসের পর মাস থেকে শূন্য মহাকর্ষে বৈজ্ঞানিক গবেষণা চালান। এটি পৃথিবী থেকে প্রায় ৪০০ কিমি উপরে অবস্থিত।

৬৫. এস্কেপ ভেলোসিটি বা মুক্তিবেগ কী?

উত্তর: কোনো গ্রহ বা বস্তুর মহাকর্ষীয় টান কাটিয়ে মহাকাশে চলে যাওয়ার জন্য যে সর্বনিম্ন গতিবেগের প্রয়োজন হয়, তাকে মুক্তিবেগ বলে। পৃথিবীর জন্য এই গতিবেগ প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১১.২ কিলোমিটার

৯. জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাস ও যন্ত্রপাতি

৬৬. দূরবীক্ষণ যন্ত্র বা টেলিস্কোপ কে আবিষ্কার করেন?

উত্তর: ১৬০৮ সালে ওলন্দাজ চশমা নির্মাতা হ্যান্স লিপারহে প্রথম টেলিস্কোপের পেটেন্ট করেন। তবে ১৬০৯ সালে গ্যালিলিও গ্যালিলিই প্রথম টেলিস্কোপ তৈরি করে তা মহাকাশ পর্যবেক্ষণে ব্যবহার করেন।

৬৭. হাবল স্পেস টেলিস্কোপের অবদান কী?

উত্তর: ১৯৯০ সালে উৎক্ষেপিত হাবল টেলিস্কোপ পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের বাইরে থেকে মহাবিশ্বের অত্যন্ত স্পষ্ট ছবি পাঠিয়েছে, যা মহাবিশ্বের বয়স নির্ধারণ এবং এর প্রসারণের হার বুঝতে বিপ্লব ঘটিয়েছে।

৬৮. জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ (JWST) কেন বিশেষ?

উত্তর: এটি এ পর্যন্ত তৈরি মানবজাতির ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী ইনফ্রারেড (অবলোহিত) স্পেস টেলিস্কোপ। এটি ধূলিকণার মেঘ ভেদ করে বিগ ব্যাং-এর ঠিক পর পরই তৈরি হওয়া প্রথম প্রজন্মের গ্যালাক্সি এবং নক্ষত্রগুলোর ছবি তুলতে সক্ষম।

৬৯. ভূ-কেন্দ্রিক বনাম সূর্য-কেন্দ্রিক তত্ত্ব কী?

উত্তর: প্রাচীনকালে ধারণা করা হতো পৃথিবী মহাবিশ্বের কেন্দ্রে অবস্থিত এবং সব কিছু একে ঘিরে ঘোরে (ভূ-কেন্দ্রিক)। পরবর্তীতে নিকোলাস কোপারনিকাস প্রমাণ করেন যে সূর্য কেন্দ্রে অবস্থিত এবং পৃথিবীসহ অন্য গ্রহগুলো সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে (সূর্য-কেন্দ্রিক)।

৭০. কেপলারের গ্রহীয় গতির সূত্রগুলো কী নির্দেশ করে?

উত্তর: জোহানেস কেপলার তিনটি সূত্র দিয়ে দেখান যে, গ্রহগুলো সূর্যকে নিখুঁত বৃত্তাকারে নয়, বরং উপবৃত্তাকার (Elliptical) কক্ষপথে প্রদক্ষিণ করে এবং সূর্যের যত কাছে আসে গ্রহের গতি তত বাড়ে।

১০. ভিনগ্রহের জীবন ও অনুসন্ধান

৭১. সেটি (SETI) কী?

উত্তর: SETI-এর পূর্ণরূপ হলো Search for Extraterrestrial Intelligence। এটি এমন এক বৈজ্ঞানিক প্রয়াস যার মাধ্যমে মহাকাশ থেকে আসা রেডিও সিগন্যাল বিশ্লেষণ করে ভিনগ্রহের বুদ্ধিমান প্রাণীদের সন্ধান করা হয়।

৭২. গোলডিলকস জোন (Goldilocks Zone) বা বাসযোগ্য অঞ্চল কী?

উত্তর: একটি নক্ষত্রের চারপাশের এমন একটি নির্দিষ্ট দূরত্বের অঞ্চল, যেখানে তাপমাত্রা খুব বেশি গরমও নয়, আবার খুব বেশি ঠাণ্ডাও নয়। এই অঞ্চলে থাকা গ্রহের পৃষ্ঠে তরল পানি থাকা সম্ভব, যা জীবনের জন্য অপরিহার্য।

৭৩. ড্রেক সমীকরণ (Drake Equation) কী?

উত্তর: বিজ্ঞানী ফ্রাঙ্ক ড্রেক একটি গাণিতিক সমীকরণ তৈরি করেন, যার মাধ্যমে আমাদের মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সিতে কতগুলো বুদ্ধিমান ও যোগাযোগক্ষম ভিনগ্রহের সভ্যতা থাকতে পারে, তার একটি আনুমানিক সংখ্যা হিসাব করা যায়।

৭৪. ফার্মি প্যারাডক্স (Fermi Paradox) কী?

উত্তর: মহাবিশ্ব যদি এতই বিশাল হয় এবং সেখানে যদি কোটি কোটি বাসযোগ্য গ্রহ থাকে, তবে এখন পর্যন্ত কোনো ভিনগ্রহের প্রাণীর বা সভ্যতার প্রমাণ আমরা কেন পাইনি? এই বৈপরীত্যকেই ফার্মি প্যারাডক্স বলা হয়।

৭৫. ভয়েজার গোল্ডেন রেকর্ড (Voyager Golden Record) কী?

উত্তর: ১৯৭৭ সালে উৎক্ষেপিত ভয়েজার ১ ও ২ মহাকাশযানে একটি করে তামার তৈরি সোনালী রেকর্ড পাঠানো হয়েছে। এতে পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষার শুভেচ্ছা বাণী, শব্দ এবং সংগীত রয়েছে, যাতে কোনো ভিনগ্রহের সভ্যতা এটি খুঁজে পেলে মানবজাতি সম্পর্কে জানতে পারে।

১১. বিশেষ মহাজাগতিক বস্তু ও ঘটনা

৭৬. উল্কা, উল্কাপিণ্ড এবং গ্রহাণুর মধ্যে পার্থক্য কী?

উত্তর: মহাকাশে ঘুরে বেড়ানো পাথুরে বস্তুকে গ্রহাণু (Asteroid) বলে। এগুলো যখন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে ঘর্ষণে জ্বলে ওঠে, তখন তাকে উল্কা (Meteor) বা তারা খসা বলে। আর যে অংশটি না পুড়ে পৃথিবীতে এসে পড়ে, তাকে উল্কাপিণ্ড (Meteorite) বলে।

৭৭. ধূমকেতু (Comet) কী?

উত্তর: ধূমকেতু হলো বরফ, ধূলিকণা এবং পাথরের তৈরি এক ধরনের মহাজাগতিক বস্তু। এটি যখন সূর্যের কাছাকাছি আসে, তখন এর বরফ বাষ্পীভূত হয়ে পেছনে একটি উজ্জ্বল লেজের মতো তৈরি করে। যেমন: হ্যালির ধূমকেতু।

৭৮. হ্যালির ধূমকেতু কত বছর পর পর দেখা যায়?

উত্তর: হ্যালির ধূমকেতু প্রতি ৭৫-৭৬ বছর পর পর পৃথিবী থেকে খালি চোখে দেখা যায়। এটি শেষবার ১৯৮৬ সালে দেখা গিয়েছিল এবং আবার ২০৬১ সালে দেখা যাবে।

৭৯. সৌরঝড় (Solar Flare) কী?

উত্তর: সূর্যের বায়ুমণ্ডলে হঠাৎ ঘটা এক বিশাল বিস্ফোরণ, যার ফলে প্রচুর পরিমাণে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কণা ও চৌম্বকীয় বিকিরণ মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে। এটি পৃথিবীর স্যাটেলাইট এবং বিদ্যুৎ গ্রিডকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

৮০. অরোরা বা মেরুজ্যোতি (Aurora) কীভাবে তৈরি হয়?

উত্তর: সূর্যের সৌরঝড় থেকে আসা চার্জিত কণাগুলো যখন পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের সাথে সংঘর্ষ লিপ্ত হয় এবং বায়ুমণ্ডলের গ্যাসের সাথে বিক্রিয়া করে, তখন মেরু অঞ্চলে আকাশে সুন্দর রঙিন আলোর খেলা দেখা যায়। একে অরোরা বলে।

১২. উন্নত পদার্থবিদ্যা ও মহাজাগতিক তত্ত্ব

৮১. কসমিক স্ট্রিং (Cosmic Strings) কী?

উত্তর: এটি মহাবিশ্বের সৃষ্টির শুরুর দিকের একটি তাত্ত্বিক ত্রুটি বা অতি সূক্ষ্ম ১-মাত্রার সুতার মতো শক্তি ক্ষেত্র, যার ঘনত্ব অসীম এবং যা মহাবিশ্ব জুড়ে বিস্তৃত থাকতে পারে বলে বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন।

৮২. মাল্টিভার্স বা বহুমাত্রিক মহাবিশ্ব তত্ত্ব (Multiverse Theory) কী?

উত্তর: এই তত্ত্ব অনুযায়ী, আমাদের এই মহাবিশ্বই একমাত্র মহাবিশ্ব নয়। এর বাইরেও অনন্ত সংখ্যক মহাবিশ্ব থাকতে পারে, যাদের ভৌত নিয়ম আমাদের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা হতে পারে।

৮৩. অ্যান্টিম্যাটার বা প্রতি-পদার্থ কী?

উত্তর: সাধারণ পদার্থের কণাগুলোর বিপরীত বৈশিষ্ট্যযুক্ত কণাকে অ্যান্টিম্যাটার বলে। যেমন ইলেকট্রনের বিপরীত হলো পজিট্রন। পদার্থ এবং প্রতি-পদার্থ একত্রে স্পর্শ করলে তারা একে অপরকে ধ্বংস করে সম্পূর্ণ শক্তিতে রূপান্তরিত হয়।

৮৪. বিগ ব্যাং-এর সময় কি সমান পরিমাণ ম্যাটার ও অ্যান্টিম্যাটার তৈরি হয়েছিল?

উত্তর: তাত্ত্বিকভাবে সমান তৈরি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু যদি তাই হতো তবে সব ধ্বংস হয়ে শুধু আলো অবশিষ্ট থাকত। কোনো এক অজানা কারণে পদার্থের পরিমাণ সামান্য বেশি ছিল, যার ফলে আজকের এই দৃশ্যমান মহাবিশ্ব টিকে আছে। একে 'ম্যাটার-অ্যান্টিম্যাটার অসামঞ্জস্যতা' বলে।

৮৫. কোয়ান্টাম এন্ট্যাঙ্গেলমেন্ট (Quantum Entanglement) কী?

উত্তর: এটি এমন একটি ঘটনা যেখানে দুটি কণা একে অপরের সাথে এমনভাবে যুক্ত হয়ে যায় যে, তাদের মধ্যকার দূরত্ব কোটি আলোকবর্ষ হলেও একটির অবস্থা পরিবর্তন করলে সাথে সাথে অপরটির অবস্থাও পরিবর্তিত হয়। আইনস্টাইন একে "Spooky action at a distance" বলেছিলেন।

১৩. মহাবিশ্বের ভবিষ্যৎ ও পরিণতি

৮৬. মহাবিশ্বের শেষ পরিণতি কী হতে পারে?

উত্তর: বিজ্ঞানীদের মতে মহাবিশ্বের প্রধানত তিনটি পরিণতি হতে পারে:

  • বিগ ফ্রিজ (Big Freeze)

  • বিগ ক্রাঞ্চ (Big Crunch)

  • বিগ রিপ (Big Rip)

৮৭. বিগ ফ্রিজ (Big Freeze) বা মহাজাগতিক মৃত্যু কী?

উত্তর: ডার্ক এনার্জির কারণে মহাবিশ্ব যদি চিরকাল প্রসারিত হতে থাকে, তবে একসময় নক্ষত্রগুলোর সব জ্বালানি শেষ হয়ে যাবে। গ্যালাক্সিগুলো অনেক দূরে চলে যাবে। পুরো মহাবিশ্ব সম্পূর্ণ অন্ধকার ও পরম শূন্য তাপমাত্রায় ঠাণ্ডা হয়ে যাবে। এটিই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য তত্ত্ব।

৮৮. বিগ ক্রাঞ্চ (Big Crunch) কী?

উত্তর: মহাবিশ্বের প্রসারণ যদি একসময় থেমে যায় এবং মহাকর্ষ বলের কারণে সবকিছু আবার সংকুচিত হতে শুরু করে, তবে মহাবিশ্বের সমস্ত পদার্থ আবার বিগ ব্যাং-এর মতো একটি বিন্দুতে ফিরে আসবে। একে বিগ ক্রাঞ্চ বলে।

৮৯. বিগ রিপ (Big Rip) কী?

উত্তর: ডার্ক এনার্জির প্রভাব যদি সময়ের সাথে প্রচণ্ড শক্তিশালী হয়ে ওঠে, তবে মহাবিশ্বের প্রসারণের গতি এত বাড়বে যে একসময় গ্যালাক্সি, নক্ষত্র, গ্রহ, এমনকি পরমাণু পর্যন্ত ছিঁড়ে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে।

৯০. কসমিক রিলিজিয়ন বা মহাজাগতিক চেতনা কী?

উত্তর: আলবার্ট আইনস্টাইনের মতে, মহাবিশ্বের নিয়ম ও শৃঙ্খলার গভীরে যে বিস্ময় ও সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে, তার প্রতি মানুষের যে পরম শ্রদ্ধা ও অনুভূতির সৃষ্টি হয়, তাকেই তিনি মহাজাগতিক ধর্মীয় অনুভূতি বা চেতনা বলেছেন।

১৪. বিবিধ কৌতূহল

৯১. মহাকাশের তাপমাত্রা কত?

উত্তর: মহাশূন্যের গড় তাপমাত্রা পরম শূন্যের সামান্য উপরে, অর্থাৎ মাইনাস ২৭০.৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস ($-270.42^\circ\text{C}$ বা ২.৭ কেলভিন)। এটি মূলত বিগ ব্যাং-এর অবশিষ্ট তাপমাত্রার (CMBR) কারণে বজায় আছে।

৯২. সূর্য কি মিল্কি ওয়ের চারদিকে ঘোরে?

উত্তর: হ্যাঁ, আমাদের পৃথিবী যেমন সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে, তেমনি সূর্যও তার পুরো সৌরজগৎ নিয়ে মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রকে প্রদক্ষিণ করছে। একবার ঘুরে আসতে সূর্যের প্রায় ২২.৫ থেকে ২৫ কোটি বছর সময় লাগে। একে এক কসমিক ইয়ার (Cosmic Year) বলে।

৯৩. চন্দ্রগ্রহণ ও সূর্যগ্রহণ কেন হয়?

উত্তর: যখন চাঁদ, পৃথিবী এবং সূর্য একই সরলরেখায় আসে এবং পৃথিবীর ছায়া চাঁদের ওপর পড়ে, তখন হয় চন্দ্রগ্রহণ। আর যখন চাঁদ পৃথিবী ও সূর্যের মাঝখানে এসে সূর্যের আলো পৃথিবীতে পড়তে বাধা দেয়, তখন হয় সূর্যগ্রহণ।

৯৪. মহাকর্ষীয় লেন্সিং (Gravitational Lensing) কী?

উত্তর: যখন কোনো দূরবর্তী গ্যালাক্সি বা ব্ল্যাক হোলের তীব্র মহাকর্ষের কারণে তার পেছন থেকে আসা আলো বেঁকে যায় এবং একটি প্রবর্ধক কাচ বা লেন্সের মতো কাজ করে পেছনের বস্তুকে বড় বা একাধিক রূপে দেখায়, তাকে মহাকর্ষীয় লেন্সিং বলে।

৯৫. মানব তৈরি কোন বস্তু মহাবিশ্বের সবচেয়ে দূরে গেছে?

উত্তর: ১৯৭৭ সালে উৎক্ষেপিত ভয়েজার ১ (Voyager 1) মহাকাশযানটি মানুষের তৈরি সবচেয়ে দূরবর্তী বস্তু। এটি সৌরজগতের সীমানা পেরিয়ে বর্তমানে আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাকাশে (Interstellar Space) ভ্রমণ করছে।

৯৬. চাঁদে কি কোনো বায়ুমণ্ডল আছে?

উত্তর: চাঁদে কোনো উল্লেখযোগ্য বায়ুমণ্ডল নেই বললেই চলে। সেখানে অত্যন্ত পাতলা গ্যাসে ভরা একটি স্তর আছে যাকে এক্সোস্ফিয়ার বলা হয়, তবে তা শ্বাস নেওয়ার বা আবহাওয়া তৈরির জন্য যথেষ্ট নয়।

৯৭. উল্কাবৃষ্টি (Meteor Shower) কেন হয়?

উত্তর: পৃথিবী যখন তার কক্ষপথে চলার সময় কোনো ধূমকেতুর রেখে যাওয়া ধূলিকণা ও ধ্বংসাবশেষের মেঘের মধ্য দিয়ে যায়, তখন প্রচুর পরিমাণে ধূলিকণা একসাথে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ঢুকে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। একেই উল্কাবৃষ্টি বলে।

৯৮. একটি নক্ষত্রের রং কী নির্দেশ করে?

উত্তর: নক্ষত্রের রং তার পৃষ্ঠের তাপমাত্রা নির্দেশ করে। নীল রঙের নক্ষত্রগুলো সবচেয়ে বেশি উত্তপ্ত হয়, আর লাল রঙের নক্ষত্রগুলোর তাপমাত্রা তুলনামূলকভাবে কম হয়। আমাদের হলুদ সূর্য মাঝারি তাপমাত্রার।

৯৯. মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় নক্ষত্র কোনটি?

উত্তর: এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত বৃহত্তম নক্ষত্রগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ইউওয়াই স্কুটি (UY Scuti) অথবা স্টিভেনসন ২-১৮ (Stephenson 2-18)। এগুলো এতই বিশাল যে এদের ভেতরে কয়েকশো কোটি সূর্য অনায়াসে এঁটে যাবে।

১০০. মহাবিশ্ব সম্পর্কে জানার সেরা উপায় কী?

উত্তর: মহাবিশ্বকে জানার জন্য প্রতিনিয়ত বিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের নতুন নতুন আবিষ্কারের খোঁজ রাখা, দূরবীক্ষণ যন্ত্রের মাধ্যমে আকাশ পর্যবেক্ষণ করা এবং নাসা (NASA), ইএসএ (ESA) বা জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের মতো আধুনিক মিশনগুলোর ডেটা অনুসরণ করা সবচেয়ে ভালো উপায়।