বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্পোরেশন, কমিশন, বোর্ড, ব্যুরো বা সংবিধিবদ্ধ সংস্থা আলাদা আলাদা নাম কেন
কখনো কি ভেবেছেন সরকারি প্রতিষ্ঠান হলেও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম ধরনের এরকম আলাদা আলাদা কেন নিচে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো
বাংলাদেশের সরকারি ও প্রশাসনিক কাঠামোতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে কর্পোরেশন, কমিশন, বোর্ড, ব্যুরো বা সংবিধিবদ্ধ সংস্থা হিসেবে অভিহিত করার মূল কারণ হলো—এদের তৈরির উদ্দেশ্য, আইনি ভিত্তি, কাজের ধরন এবং স্বায়ত্তশাসনের মাত্রা একে অপরের থেকে আলাদা।
সরকার যখন কোনো বিশেষ দায়িত্ব পালন বা সেবা প্রদানের সিদ্ধান্ত নেয়, তখন সাধারণ প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়ের লালফিতার দৌরাত্ম্য এড়িয়ে কাজের ধরন অনুযায়ী উপযুক্ত কাঠামো নির্ধারণ করা হয়। নিচে এদের পৃথক পরিচয়, ক্ষমতা ও কার্যপরিধি বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. সংবিধিবদ্ধ সংস্থা (Statutory Body)
সংবিধিবদ্ধ সংস্থা হলো এমন কোনো প্রতিষ্ঠান যা সংবিধানের কোনো নির্দিষ্ট অনুচ্ছেদ অথবা জাতীয় সংসদের বিশেষ কোনো আইন/অধ্যাদেশ দ্বারা গঠিত হয়। (উল্লেখ্য: কর্পোরেশন, বোর্ড বা কমিশনের একটি বড় অংশই আইনের মাধ্যমে সৃষ্ট বলে তারাও সংবিধিবদ্ধ সংস্থার অংশ)।
- গঠন ও আইনি ভিত্তি: সংসদীয় আইন বা রাষ্ট্রপতি কর্তৃক জারি করা অধ্যাদেশের মাধ্যমে গঠিত। এরা নিজস্ব আইনি সত্তার (Legal Personality) অধিকারী—অর্থাৎ প্রতিষ্ঠান নিজের নামে মামলা করতে বা চুক্তি করতে পারে।
- ক্ষমতা ও কার্যপরিধি: এদের নীতি নির্ধারণ ও পরিচালনায় নিজস্ব পরিচালনা পর্ষদ থাকে। এরা নিজস্ব বাজেট ও সরকারি তহবিলের সমন্বয়ে চলে।
- উদাহরণ: রাজউক (RAJUK), চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (UGC)।
২. কমিশন (Commission)
‘কমিশন’ হলো বিশেষ সাংবিধানিক বা সংবিধিবদ্ধ ক্ষমতা সম্পন্ন উচ্চপর্যায়ের সংস্থা। স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে বিচার বিভাগীয়, প্রশাসনিক বা তদারকি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কমিশন গঠন করা হয়।
- গঠন ও আইনি ভিত্তি: কিছু কমিশন সরাসরি সংবিধানের অধীনে তৈরি (সাংবিধানিক সংস্থা), আর কিছু বিশেষ আইনের মাধ্যমে তৈরি (সংবিধিবদ্ধ কমিশন)।
- ক্ষমতা ও কার্যপরিধি: কমিশনকে সাধারণত সরকারের থেকে উচ্চমাত্রার স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হয়, যাতে তারা কোনো রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক চাপ ছাড়া সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এদের তদন্ত করা, রেগুলেট বা নিয়ন্ত্রণ করা এবং সরকারের কাছে সুপারিশ বা বার্ষিক প্রতিবেদন পেশ করার ক্ষমতা থাকে।
-
উদাহরণ:
- সাংবিধানিক কমিশন: নির্বাচন কমিশন (EC), সরকারি কর্ম কমিশন (BPSC)।
- সংবিধিবদ্ধ কমিশন: দুর্নীতি দমন কমিশন (ACC), মানবাধিকার কমিশন, বিটিআরসি (BTRC)।
৩. কর্পোরেশন (Corporation)
‘কর্পোরেশন’ হলো মূলত সরকারের বাণিজ্য বা সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। সরকারি সেবা বা পণ্য বাণিজ্যিকভাবে বা স্বাবলম্বী উপায়ে জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়াই এর মূল কাজ।
- গঠন ও আইনি ভিত্তি: সাধারণ কোম্পানি বা বিশেষ সরকারি আইনের অধীনে বাণিজ্যিক সত্তা হিসেবে গঠিত।
- ক্ষমতা ও কার্যপরিধি: এরা ব্যাবসায়িক কাঠামোর মতো পরিচালিত হয়। আয়-ব্যয়, লাভ-ক্ষতি এবং নিজস্ব তহবিল ব্যবস্থাপনার স্বাধীনতা এদের থাকে। বাণিজ্য পরিচালনা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং নাগরিক সেবা দেওয়াই এদের মূল পরিধি।
- উদাহরণ: বাংলাদেশ বিমান কর্পোরেশন, পেট্রোবাংলা, সিটি কর্পোরেশনসমূহ, বিআরটিসি (BRTC)।
৪. বোর্ড (Board)
‘বোর্ড’ হলো কোনো নির্দিষ্ট খাত, বিষয় বা অঞ্চল পরিচালনার জন্য গঠিত একটি বিশেষজ্ঞ বা নীতি-নির্ধারণী কমিটি/সংস্থা।
- গঠন ও আইনি ভিত্তি: সরকারি অধ্যাদেশ বা আইনের অধীনে নির্দিষ্ট খাত তদারকির জন্য বোর্ড গঠিত হয়।
- ক্ষমতা ও কার্যপরিধি: এরা সাধারণত নীতি নির্ধারণ, পরীক্ষা পরিচালনা, রাজস্ব আদায় বা বিশেষ খাতের উন্নয়নমূলক কাজ তদারকি করে। তবে কর্পোরেশনের মতো পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন ব্যবসা পরিচালনা এদের উদ্দেশ্য নয়।
- উদাহরণ: জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR), মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডসমূহ, চা বোর্ড, তাঁত বোর্ড।
৫. ব্যুরো (Bureau)
‘ব্যুরো’ মূলত সরকারের একটি বিশেষায়িত বিভাগ বা অধিদপ্তর, যা নির্দিষ্ট কোনো টেকনিক্যাল, তথ্যসংক্রান্ত বা তদন্তমূলক কাজে নিয়োজিত থাকে।
- গঠন ও আইনি ভিত্তি: এটি সাধারণত সরাসরি কোনো মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ প্রশাসনিক ইউনিট বা বিভাগ হিসেবে কাজ করে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এরা সংবিধিবদ্ধ সংস্থা নয়, বরং সরাসরি সরকারি কাঠামোর অংশ।
- ক্ষমতা ও কার্যপরিধি: সরকারি নীতি বাস্তবায়নে বিশেষ দক্ষতা (যেমন: তথ্য সংগ্রহ, জরিপ, বিশেষ তদন্ত) প্রয়োগ করে। এদের নিজস্ব স্বাধীন আইনি সত্তা থাকে না; এরা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক অধীনে থাকে।
- উদাহরণ: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS), দুর্নীতি দমন ব্যুরো (অতীতের, যা বর্তমানে কমিশন), ব্যুরো অব ম্যানপাওয়ার এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড ট্রেনিং (BMET)।
সংক্ষিপ্ত এক নজরে পার্থক্য:
|
মূল উদ্দেশ্য |
স্বায়ত্তশাসনের মাত্রা |
আইনি নিজস্ব সত্তা? |
|
|---|---|---|---|
|
কমিশন |
স্বাধীন তদারকি, নিয়ন্ত্রণ ও সুপারিশ |
সর্বোচ্চ |
হ্যাঁ |
|
কর্পোরেশন |
বাণিজ্যিক ও সরাসরি নাগরিক সেবা |
মাঝারি থেকে উচ্চ |
হ্যাঁ |
|
বোর্ড |
নির্দিষ্ট খাতের নীতি ও প্রশাসন |
মাঝারি |
সাধারণত হ্যাঁ |
|
ব্যুরো |
টেকনিক্যাল, তথ্য বা তদন্তমূলক কাজ |
কম (মন্ত্রণালয়াধীন) |
সাধারণত না |
|
সংবিধিবদ্ধ সংস্থা |
আইনের মাধ্যমে সৃষ্ট সার্বিক ক্যাটাগরি |
নির্ধারিত আইন অনুযায়ী |
হ্যাঁ |
সারসংক্ষেপে কাজের ধরণ যখন নিয়ন্ত্রণভিত্তিক তখন 'কমিশন', যখন বাণিজ্যিক/সেবামূলক তখন 'কর্পোরেশন', যখন খাতভিত্তিক ব্যবস্থাপনা তখন 'বোর্ড', আর যখন বিশেষায়িত প্রশাসনিক সেবা তখন 'ব্যুরো' কাঠামো ব্যবহার করা হয়
