জটিল প্রবিধানের ফাঁদে পলিটেকনিক শিক্ষা: ড্রপ আউট সংকট ও শিক্ষার্থী হ্রাসের নেপথ্য কথা
বাংলাদেশের কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ব্যবস্থা যখন দেশের শিল্পোন্নয়ন ও বেকারত্ব দূরীকরণের মূল হাতিয়ার হওয়ার কথা, তখন দেশের পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলো মুখোমুখি হচ্ছে এক অভাবনীয় সংকট—শিক্ষার্থী সংখ্যা দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়া। প্রথম সারির সরকারি ও বেসরকারি পলিটেকনিকগুলোতে আসন ফাঁকা থাকার চিত্র এখন নিয়মিত ঘটনা। এই সংকটের পেছনে অবকাঠামোগত বা সামাজিক অনেক কারণ থাকলেও, অন্যতম প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের (BTEB) কঠোর ও অস্থিতিস্থাপক ‘ড্রপ আউট ও সেমিস্টার ড্রপ’ প্রবিধান।
রেজিস্ট্রেশনের মেয়াদ থাকা সত্ত্বেও সুযোগের অভাব
কারিগরি বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী, চার বছরের ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্সের বিপরীতে একজন শিক্ষার্থীর নিবন্ধনের (Registration) মেয়াদ থাকে মোট সাত বছর (১৪ সেমিস্টার)। যুক্তি অনুযায়ী, এই সাত বছরের মধ্যে প্রয়োজনীয় সব ক্রেডিট বা বিষয় সম্পন্ন করতে পারলেই শিক্ষার্থীর ডিগ্রি পাওয়ার কথা। কিন্তু প্রবিধানের কঠোর শর্তের কারণে কোনো শিক্ষার্থী একটি সেমিস্টারে চারটির বেশি বিষয়ে অকৃতকার্য হলেই তাকে সরাসরি "সেমিস্টার ড্রপ" করিয়ে আবার একই পর্বে আটকে দেওয়া হয়।
এটি একটি চরম বৈপরীত্য। যেখানে শিক্ষার্থীর দাপ্তরিক নিবন্ধনের মেয়াদ পর্যাপ্ত রয়েছে, সেখানে মাঝপথে এভাবে আটকে না রেখে তাকে ক্রেডিট অর্জনের সুযোগ দিয়ে পরবর্তী সেমিস্টারে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া যেত। যদি প্রবিধান সংশোধন করে রেজিস্ট্রেশনের মেয়াদ থাকা পর্যন্ত নিয়মিত ক্লাসের পাশাপাশি ব্যাকলগ বা বিশেষ পরীক্ষা (Supplement/Make-up exam) দিয়ে অনুত্তীর্ণ বিষয়গুলো পাস করার সুযোগ চালু থাকত, তবে বহু শিক্ষার্থী ড্রপ আউট না হয়ে সফলভাবে তাদের ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করতে পারত। প্রবিধানের এই অযথা জটিলতায় প্রতিবছর হাজারো সম্ভাবনাময় শিক্ষার্থীর একাডেমিক জীবন স্থবির হয়ে পড়ছে।
সামাজিক নেতিবাচক বার্তা ও তথাকথিত ‘কঠিন পড়াশোনা’র ভীতি
শিক্ষার্থী ড্রপ আউট হওয়া বা সেমিস্টার আটকে যাওয়া কেবল একাডেমিক ক্ষতিতেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি সমাজে অত্যন্ত নেতিবাচক বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে। চারটির বেশি বিষয়ে আটকে গেলেই যখন একজন শিক্ষার্থী বছরের পর বছর হারিয়ে ফেলে বা ঝরে পড়ে, তখন সাধারণ মানুষের মনে একটি ভুল ধারণা বদ্ধমূল হচ্ছে যে—‘পলিটেকনিকে পড়লে হয়তো সহজে পাস করা যায় না বা ডিপ্লোমা পাস করা অসম্ভব কঠিন।’
এই ভুল সামাজিক বার্তার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ড্রপ আউট হওয়া শিক্ষার্থী বা তার অভিভাবকরা নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে পরিচিত জনদের পলিটেকনিকে ভর্তি হতে নিরুৎসাহিত করছেন। যেকোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় প্রচারক হলো তার বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা। কিন্তু যখন একজন শিক্ষার্থী নিয়মকানুন ও ড্রপ আউটের গ্যাঁড়াকলে পড়ে হতাশ হয়ে বের হয়, তখন তার পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের কেউ আর সন্তানকে পলিটেকনিকে পাঠাতে সাহস পান না। ফলে সাধারণ ধারার (General Education) দিকে ঝুঁকে পড়ছে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী।
পলিটেকনিকে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার অন্যান্য মূল কারণ
ড্রপ আউট সংকট ছাড়া পলিটেকনিকগুলোতে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার পেছনে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ বিদ্যমান:
- ল্যাব ও আধুনিক যন্ত্রপাতির ঘাটতি: বহু পলিটেকনিকে যুগের সাথে তাল মেলাতে পারে এমন আধুনিক টেকনোলজি বা ল্যাব সরঞ্জাম নেই। ফলে শিক্ষার্থীরা প্র্যাকটিক্যাল জ্ঞান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
- শিক্ষক ও অভিজ্ঞ প্রশিক্ষকের অভাব: কারিগরি শিক্ষার মূল ভিত্তি হলো হাতে-কলমে শেখা। কিন্তু পর্যাপ্ত ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাবে শিক্ষার মান নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
- চাকরির বাজারে উপযুক্ত মূল্যায়নের অভাব: ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের উপ-সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে সরকারি চাকরিতে সুযোগ থাকলেও বেসরকারি খাতে তাদের বেতন কাঠামো ও কাজের পরিবেশ এখনো বৈষম্যমূলক।
- উচ্চশিক্ষার সীমিত সুযোগ: ডিপ্লোমা শেষ করে সরকারি কোনো প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (যেমন- DUET) বিএসসি করার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত, যা উচ্চাকাঙ্ক্ষী শিক্ষার্থীদের ব্যাকফুটে ঠেলে দেয়।
উত্তরণের উপায় ও সিদ্ধান্ত
পলিটেকনিক শিক্ষাকে বাঁচাতে এবং শিক্ষার্থীদের ফিরিয়ে আনতে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের প্রবিধান অবিলম্বে যুগোপযোগী করা প্রয়োজন।
১. প্রবিধান সংশোধন: চারটির বেশি বিষয়ে ফেল করলেই সেমিস্টার আটকে দেওয়ার নিমোঘ নিয়ম বাতিল করতে হবে। রেজিস্ট্রেশনের মেয়াদ (৭ বছর) বহাল থাকা পর্যন্ত শিক্ষার্থীকে পরবর্তী সেমিস্টারে প্রমোশন দিয়ে সামার সেমিস্টার বা ব্যাকলগ পরীক্ষার মাধ্যমে বিষয়গুলো ক্লিয়ার করার সুযোগ দিতে হবে।
২. ক্রেডিট ভিত্তিক ক্রেডিট ট্রান্সফার ও নমনীয়তা: বিশ্বের অন্যান্য দেশের (যেমন- ভারত বা উন্নত বিশ্ব) মতো ‘ATKT’ (Allowed To Keep Term) বা জিপিএ/ক্রেডিট ভিত্তিক মূল্যায়ন চালু করা জরুরি।
শিক্ষার্থী ঝরে পড়া ঠেকানো এবং প্রবিধানকে সহজ ও শিক্ষার্থীবান্ধব করাই হতে পারে পলিটেকনিক শিক্ষার হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনার প্রথম এবং প্রধান পদক্ষেপ।
