বিভিন্ন প্রকার অ্যান্টিবায়োটিক এবং তাদের কথা
১. পেনিসিলিন: এক অভাবনীয় দুর্ঘটনা (Penicillins)
অ্যান্টিবায়োটিকের ইতিহাস শুরু হয় ১৯২৮ সালে একটি "ভুল" থেকে। সেন্ট মেরি হাসপাতালের ল্যাবরেটরিতে স্কটিশ বিজ্ঞানী আলেকজান্ডার ফ্লেমিং ছুটিতে যাওয়ার আগে কিছু ব্যাকটেরিয়ার পেট্রি ডিশ সাজিয়ে রেখেছিলেন।
আবিষ্কার: ছুটিতে ফিরে তিনি দেখেন, একটি ডিশে ছত্রাক (Penicillium notatum) জন্মেছে এবং সেই ছত্রাকের চারপাশের ব্যাকটেরিয়াগুলো মারা গেছে। তিনি বুঝতে পারেন এই ছত্রাক থেকে এমন কিছু নিঃসৃত হচ্ছে যা ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করছে।
বাণিজ্যিক রূপান্তর: ফ্লেমিং আবিষ্কার করলেও এটি ওষুধ হিসেবে তৈরি করা কঠিন ছিল। পরবর্তীতে ১৯৪০-এর দশকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের হাওয়ার্ড ফ্লোরি এবং আর্নস্ট চেইন একে বিশুদ্ধ করে ওষুধে রূপান্তর করেন। ১৯৪৫ সালে এই তিন বিজ্ঞানীই নোবেল পুরস্কার পান।
ব্যবহার: স্ট্রেপটোকক্কাস এবং স্ট্যাফিলোকক্কাস জনিত ইনফেকশনে এটি এখনো ব্যবহৃত হয়।
২. সালফোনামাইডস: প্রথম রাসায়নিক অস্ত্র (Sulfonamides)
পেনিসিলিন ল্যাবে আবিষ্কৃত হলেও বাজারে প্রথম সফল অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল ড্রাগ ছিল প্রনটোসিল (Prontosil)।
আবিষ্কার: ১৯৩২ সালে জার্মান রসায়নবিদ গেরহার্ড ডোমাগ (Gerhard Domagk) এটি আবিষ্কার করেন। মজার ব্যাপার হলো, ডোমাগ তার নিজের মেয়ের প্রাণ বাঁচাতে এই ড্রাগটি প্রথম ব্যবহার করেছিলেন, যখন সে স্ট্রেপটোকক্কাস ইনফেকশনে আক্রান্ত হয়েছিল।
গুরুত্ব: এটি প্রাকৃতিক ছত্রাক থেকে নয়, বরং কৃত্রিম রঞ্জক (Dye) থেকে তৈরি করা হয়েছিল। ১৯৩৯ সালে তিনি এ জন্য নোবেল পুরস্কার পান।
৩. স্ট্রেপটোমাইসিন: যক্ষ্মার যম (Streptomycin)
পেনিসিলিন অনেক কিছু সারিয়ে তুললেও যক্ষ্মা (TB) এর কাছে হার মেনেছিল।
আবিষ্কার: ১৯৪৩ সালে আমেরিকার রাটগার্স বিশ্ববিদ্যালয়ে সেলম্যান ওয়াকসম্যান এবং তার ছাত্র আলবার্ট শাটজ এটি মাটি থেকে পাওয়া ব্যাকটেরিয়া (Streptomyces griseus) থেকে আবিষ্কার করেন।
ইতিহাস: এটিই ছিল যক্ষ্মা রোগের প্রথম সফল চিকিৎসা। "অ্যান্টিবায়োটিক" শব্দটি ওয়াকসম্যান-ই প্রথম জনপ্রিয় করেন।
৪. টেট্রাসাইক্লিন ও ব্রড-স্পেকট্রাম অ্যান্টিবায়োটিক (Broad-Spectrum)
১৯৪০-এর দশকের শেষের দিকে বিজ্ঞানীরা এমন অ্যান্টিবায়োটিক খুঁজছিলেন যা একসাথে অনেক ধরণের ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কাজ করতে পারে।
আবিষ্কার: ১৯৪৮ সালে বেঞ্জামিন ডুগার মাটি থেকে গোল্ডেন কালারের একটি ছত্রাক পান, যা থেকে তৈরি হয় প্রথম টেট্রাসাইক্লিন (Chlortetracycline)।
প্রভাব: এটি ব্যাকটেরিয়া কোষের প্রোটিন তৈরি বন্ধ করে দেয়, ফলে তারা আর বংশবৃদ্ধি করতে পারে না।
৫. সেফালোস্পোরিন (Cephalosporins)
এটি পেনিসিলিনের বিকল্প হিসেবে আসে কারণ অনেক ব্যাকটেরিয়া পেনিসিলিন প্রতিরোধী হয়ে উঠছিল।
আবিষ্কার: ১৯৪৫ সালে ইতালীয় বিজ্ঞানী জিউসেপ ব্রোটজু সার্ডিনিয়ার একটি নর্দমার জলের কাছে পাওয়া ছত্রাক থেকে এটি প্রথম চিহ্নিত করেন। পরবর্তীতে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় একে উন্নত করে।
অ্যান্টিবায়োটিকের প্রকারভেদ ও কাজের পদ্ধতি
নিচে একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা দেওয়া হলো যা দিয়ে সহজে বোঝা যাবে কোন অ্যান্টিবায়োটিক কীভাবে কাজ করে:
| প্রকার (Class) | উদাহরণ | কাজের ধরন |
| Beta-Lactams | পেনিসিলিন, এমোক্সিসিলিন | ব্যাকটেরিয়ার কোষের দেয়াল (Cell Wall) নষ্ট করে দেয়। |
| Macrolides | অ্যাজিথ্রোমাইসিন | ব্যাকটেরিয়ার প্রোটিন তৈরিতে বাধা দেয়। |
| Quinolones | সিপ্রোফ্লক্সাসিন | ব্যাকটেরিয়ার DNA প্রতিলিপি তৈরিতে বাধা দেয়। |
| Aminoglycosides | জেন্টামাইসিন | প্রোটিন সংশ্লেষণ বন্ধ করে ব্যাকটেরিয়ার মৃত্যু ঘটায়। |
পরিশেষে বলবো অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার "অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স" তৈরি করছে। অর্থাৎ, ব্যাকটেরিয়া এই ওষুধগুলোর বিরুদ্ধে নিজেদের শক্তিশালী করে তুলছে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এবং কোর্স সম্পন্ন না করে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
