পলিথিন বা পলিইথিলিন
পলিথিন বা পলিইথিলিন হলো বিশ্বের সবচেয়ে সাধারণ প্লাস্টিক। এটি মূলত ইথিলিন ($C_2H_4$) নামক মনোমার থেকে তৈরি একটি পলিমার। শিল্পকারখানায় পলিথিন উৎপাদনের প্রক্রিয়াটি বেশ জটিল এবং বিভিন্ন ধাপের সমন্বয়ে গঠিত।
নিচে পলিথিন উৎপাদনের মূল পর্যায়গুলো আলোচনা করা হলো:
১. কাঁচামাল সংগ্রহ (Raw Material)
পলিথিনের প্রধান কাঁচামাল হলো ইথিলিন গ্যাস। এটি মূলত প্রাকৃতিক গ্যাস বা অপরিশোধিত খনিজ তেল (Crude Oil) থেকে পাওয়া যায়। পেট্রোকেমিক্যাল কারখানায় 'ক্র্যাকিং' (Cracking) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হাইড্রোকার্বন ভেঙে ইথিলিন তৈরি করা হয়।
২. পলিমারকরণ প্রক্রিয়া (Polymerization)
এটি পলিথিন তৈরির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এই ধাপে হাজার হাজার ইথিলিন অণু একে অপরের সাথে যুক্ত হয়ে দীর্ঘ শিকল বা পলিমার গঠন করে। রাসায়নিকভাবে বিক্রিয়াটি নিম্নরূপ:
উৎপাদন পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে পলিথিনকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা হয়:
ক. উচ্চ ঘনত্ববিশিষ্ট পলিথিন (HDPE)
এটি তৈরি করতে তুলনামূলক কম চাপ ও তাপমাত্রা প্রয়োজন হয় (সাধারণত ১০-৮০ বার চাপ এবং ৭০-৩০০° সেলসিয়াস তাপমাত্রা)। এখানে জিগলার-নাটা (Ziegler-Natta) বা মেটালোসিন ক্যাটালিস্ট (অনুঘটক) ব্যবহার করা হয়। এর শিকলগুলো খুব সোজা থাকে, তাই এটি বেশ শক্ত ও টেকসই হয়।
ব্যবহার: পানির বোতল, বালতি, পাইপ ইত্যাদি।
খ. নিম্ন ঘনত্ববিশিষ্ট পলিথিন (LDPE)
এটি অত্যন্ত উচ্চ চাপে (১০০০-৩০০০ বার) এবং উচ্চ তাপমাত্রায় (৮০-৩০০° সেলসিয়াস) তৈরি করা হয়। এতে অক্সিজেন বা জৈব পারক্সাইডকে সূচনাকারী (Initiator) হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এর শিকলগুলো অনেক শাখা-প্রশাখাযুক্ত থাকে, তাই এটি নমনীয় হয়।
ব্যবহার: শপিং ব্যাগ, প্লাস্টিক ফিল্ম, প্যাকেটজাতকরণের মোড়ক।
৩. উৎপাদনের মূল ধাপসমূহ (Production Steps)
সংকোচন (Compression): প্রথমে ইথিলিন গ্যাসকে উচ্চচাপে সংকুচিত করা হয়।
বিক্রিয়া (Reaction): একটি রিঅ্যাক্টরের ভেতরে নির্দিষ্ট তাপমাত্রা এবং অনুঘটকের উপস্থিতিতে পলিমারকরণ বিক্রিয়া ঘটানো হয়।
পৃথকীকরণ (Separation): বিক্রিয়া শেষে মিশ্রণ থেকে অপলিথিনযুক্ত ইথিলিন গ্যাস আলাদা করে আবার ব্যবহারের জন্য পাঠানো হয়।
এক্সট্রুশন (Extrusion): গরম ও গলিত পলিথিনকে একটি সরু ছিদ্রের মধ্য দিয়ে বের করে আনা হয় এবং ঠান্ডা করে দানাদার বা পেলেট (Pellet) আকারে কাটা হয়।
৪. পণ্য উৎপাদন (Fabrication)
এই দানাদার পলিথিনগুলোই হলো মূল কাঁচামাল। এরপর বিভিন্ন পদ্ধতিতে চূড়ান্ত পণ্য তৈরি হয়:
ব্লো মোল্ডিং: বোতল বা ফাঁপা পাত্র তৈরির জন্য।
ইনজেকশন মোল্ডিং: খেলনা বা জটিল আকৃতির বস্তু তৈরির জন্য।
ফিল্ম এক্সট্রুশন: পাতলা ব্যাগ বা শিট তৈরির জন্য।
৫. পরিবেশগত প্রভাব
পলিথিন পচনশীল (Non-biodegradable) নয়, তাই এটি পরিবেশের জন্য চরম হুমকিস্বরূপ। এটি মাটি ও পানির গুণাগুণ নষ্ট করে এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থায় বাধা সৃষ্টি করে। বর্তমানে পলিথিনের বিকল্প হিসেবে বায়ো-প্লাস্টিক বা পাটের তৈরি ব্যাগের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।