বাংলাদেশে জ্বালানি
বাংলাদেশে জ্বালানি খাতের প্রধান মেরুদণ্ড হলো প্রাকৃতিক গ্যাস। দেশের মোট প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহের একটি বিশাল অংশ এই গ্যাস থেকে আসে। বাংলাদেশে প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন প্রক্রিয়া অনুসন্ধান থেকে শুরু করে গ্রাহক পর্যায়ে পৌঁছানো পর্যন্ত কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয়।
নিচে বাংলাদেশে প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনের বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরা হলো:
১. অনুসন্ধান ও খনি শনাক্তকরণ
বাংলাদেশে সাধারণত স্থলভাগ (Onshore) এবং জলভাগে (Offshore) গ্যাস অনুসন্ধান করা হয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলা এর অধীনে বাপেক্স (BAPEX) মূলত এই অনুসন্ধানের কাজ পরিচালনা করে। এছাড়া আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলো (IOC) যেমন শেভরন বা ক্রিসএনার্জি উৎপাদন অংশীদারিত্ব চুক্তির (PSC) মাধ্যমে কাজ করে।
সিসমিক সার্ভে: ভূগর্ভস্থ গঠন বোঝার জন্য ২ডি বা ৩ডি সিসমিক সার্ভে করা হয়।
অনুসন্ধানমূলক কূপ খনন: মাটির গভীর স্তরে গ্যাসের অস্তিত্ব নিশ্চিত করতে রিগ ব্যবহার করে কূপ খনন করা হয়।
২. উত্তোলন প্রক্রিয়া (Extraction)
গ্যাস ক্ষেত্রে যখন গ্যাসের সন্ধান নিশ্চিত হয়, তখন সেখানে উৎপাদন কূপ (Production Well) তৈরি করা হয়।
ড্রিলিং: কয়েক হাজার ফিট গভীর পর্যন্ত খনন করে পাইপ স্থাপন করা হয়।
ক্রিসমাস ট্রি স্থাপন: কূপের মাথায় চাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য একগুচ্ছ ভালভ বা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বসানো হয়, যাকে প্রকৌশলবিদ্যার ভাষায় 'Christmas Tree' বলা হয়। ভূগর্ভস্থ উচ্চ চাপের কারণে গ্যাস স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওপরে উঠে আসে।
৩. প্রক্রিয়াকরণ (Processing)
খনি থেকে পাওয়া গ্যাস সরাসরি ব্যবহারের উপযোগী থাকে না। এর সাথে পানি, বালু এবং বিভিন্ন উপজাত তরল (যেমন কনডেনসেট) থাকে। এগুলো আলাদা করার জন্য গ্যাস ক্ষেত্রে 'গ্যাস প্রসেস প্ল্যান্ট' থাকে।
সেপারেশন: গ্যাস থেকে পানি এবং বালু আলাদা করা হয়।
গ্লাইকল ইউনিট: গ্যাসের আর্দ্রতা বা পানি শুষে নেওয়া হয় যাতে পাইপলাইনে জং না ধরে।
কনডেনসেট রিকভারি: গ্যাস থেকে পাওয়া তরল উপজাত (Condensate) আলাদা করা হয়, যা পরবর্তীতে পেট্রোল বা ডিজেল তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
৪. গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণ (Transmission & Distribution)
প্রক্রিয়াজাত গ্যাস উচ্চ চাপে সঞ্চালন পাইপলাইনের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে পাঠানো হয়।
সঞ্চালন: গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড (GTCL) সারা দেশে প্রধান পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহ করে।
বিতরণ: তিতাস, বাখরাবাদ, জালালাবাদ, কর্ণফুলী ইত্যাদি বিতরণ কোম্পানিগুলো গ্রাহক পর্যায়ে (শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও বাসা-বাড়ি) গ্যাস পৌঁছে দেয়।
৫. বাংলাদেশের প্রধান গ্যাস ক্ষেত্রসমূহ
বাংলাদেশে বর্তমানে ২৯টি আবিষ্কৃত গ্যাস ক্ষেত্র রয়েছে (সংখ্যাটি পরিবর্তনশীল)। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
বিবিয়ানা: বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় উৎপাদনকারী গ্যাস ক্ষেত্র।
তিতাস: অন্যতম প্রাচীন ও বড় গ্যাস ক্ষেত্র।
হবিগঞ্জ, রশিদপুর এবং কৈলাশটিলা।
৬. বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও এলএনজি (LNG)
দেশীয় গ্যাসের মজুত কমে আসায় এবং চাহিদা ক্রমাগত বাড়তে থাকায় বাংলাদেশ এখন এলএনজি (Liquefied Natural Gas) আমদানির ওপর নির্ভর করছে। কাতার বা ওমান থেকে তরল আকারে গ্যাস এনে মহেশখালীর 'ফ্লোটিং স্টোরেজ রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট' (FSRU)-এর মাধ্যমে পুনরায় গ্যাসে রূপান্তর করে জাতীয় গ্রিডে যোগ করা হচ্ছে।
৭. গ্যাসের ব্যবহারিক বিভাজন
বাংলাদেশে উৎপাদিত গ্যাসের সিংহভাগ ব্যবহৃত হয়:
বিদ্যুৎ উৎপাদনে (সবচেয়ে বেশি)।
শিল্পকারখানায় (ক্যাপটিভ পাওয়ার ও বয়লার)।
সার উৎপাদনে (কাঁচামাল হিসেবে)।
গৃহস্থালি ও সিএনজি (CNG) খাতে।
সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং নতুন নতুন কূপ খননের মাধ্যমে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানো বর্তমানে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে বড় লক্ষ্য।