রেডিও ও টিভি চ্যানেলের ফ্রিকোয়েন্সি কীভাবে নির্ধারিত হয় ppp

রেডিও এবং টিভি চ্যানেল আমাদের বাসা-বাড়িতে বা গাড়িতে কীভাবে নিরবচ্ছিন্নভাবে সিগন্যাল পাঠায়, তা একটি নির্দিষ্ট ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে। এটি কীভাবে কাজ করে, কীভাবে নির্ধারিত হয় এবং এর আর্থিক দিকগুলো নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

​১. ফ্রিকোয়েন্সি কীভাবে কাজ করে?

​ফ্রিকোয়েন্সি মূলত ইলেকট্রোম্যাগনেটিক বা তারহীন তরঙ্গের (Electromagnetic Waves) গতি ও কম্পাঙ্ক।

  • কম্পাঙ্ক বা Frequency: প্রতি সেকেন্ডে একটি তরঙ্গ যতবার উঠানামা করে, তাকে তার ফ্রিকোয়েন্সি বলে। এর একক হার্টজ (Hz)
    • ​১ কিলোহার্টজ (1\text{ kHz}) = ১,০০০ বার/সেকেন্ড
    • ​১ মেগাহার্টজ (1\text{ MHz}) = ১০,০০,০০০ বার/সেকেন্ড
  • সিগন্যাল ট্রান্সমিশন: রেডিও বা টিভি স্টেশন থেকে অডিও এবং ভিডিও সিগন্যালকে ইলেকট্রিক সিগন্যালে রূপান্তর করা হয়। এরপর একে ক্যারিয়ার ওয়েভ (Carrier Wave) বা একটি নির্দিষ্ট ফ্রিকোয়েন্সির তরঙ্গের সাথে যুক্ত করে টাওয়ারের মাধ্যমে বাতাসে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
  • টিউনিং: আপনার রেডিও বা টিভি যখন কোনো নির্দিষ্ট স্টেশনে (যেমন: FM 88.0 MHz) টিউন করেন, তখন টিভির ভেতরে থাকা রিসিভার কেবল ওই ৮৮.০ মেগাহার্টজ কম্পাঙ্কের তরঙ্গটি গ্রহণ করে এবং বাকি তরঙ্গগুলোকে বাদ দেয়।

​২. রেডিও ও টিভির ফ্রিকোয়েন্সি ব্যান্ড

​কাজের সুবিধার্থে রেডিও ও টিভির জন্য আন্তর্জাতিকভাবে নির্দিষ্ট কিছু ব্যান্ড বরাদ্দ রাখা হয়েছে:

মাধ্যম

ব্যবহারের ব্যান্ড

কাজের ধরন

AM রেডিও

Medium Wave (530\text{ kHz} - 1710\text{ kHz})

অনেক দূর পর্যন্ত যায়, কিন্তু শব্দ অত পরিষ্কার নয়।

FM রেডিও

VHF Band (88\text{ MHz} - 108\text{ MHz})

পরিষ্কার স্টেরিও সাউন্ড, কিন্তু সীমিত দূরত্ব (৩০–৮০ কিমি) পর্যন্ত যায়।

টেরেস্ট্রিয়াল টিভি

VHF (54 - 216\text{ MHz}) ও UHF (470 - 806\text{ MHz})

অ্যানালগ বা এনালগ অ্যান্টেনা দিয়ে টিভি দেখার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়।

স্যাটেলাইট টিভি

Ku-Band (12 - 18\text{ GHz}) ও C-Band (4 - 8\text{ GHz})

টিভি চ্যানেলগুলো ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহার করে মহাকাশের স্যাটেলাইটে সিগন্যাল পাঠায় (Downlink/Uplink)।



৩. ফ্রিকোয়েন্সি কীভাবে নির্ধারিত হয়?

​বাতাসে ফ্রিকোয়েন্সি একটি সীমিত জাতীয় সম্পদ (Finite National Resource)। একই এলাকায় দুটি চ্যানেল যদি একই ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহার করে, তবে ইন্টারফেয়ারেন্স (Interference) বা সিগন্যাল জ্যাম হয়ে যাবে এবং কোনো চ্যানেলই স্পষ্ট শোনা বা দেখা যাবে না।

​তাই ফ্রিকোয়েন্সি বরাদ্দ আন্তর্জাতিক ও জাতীয়—এই দুই ধাপে নির্ধারিত হয়:

​ক) আন্তর্জাতিক ধাপ (ITU)

​জাতিসংঘের সংস্থা ITU (International Telecommunication Union) বিশ্বজুড়ে রেডিও ও টিভি ফ্রিকোয়েন্সির বন্টন সমন্বয় করে, যাতে এক দেশের সীমান্ত সিগন্যাল অন্য দেশের সিগন্যালে বাধা না সৃষ্টি করে।

​খ) জাতীয় ধাপ (নিয়ন্ত্রক সংস্থা)

​প্রতিটি দেশের সরকারি টেলিকম নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফ্রিকোয়েন্সি বণ্টন করে।

  • বাংলাদেশে: এটি নিয়ন্ত্রণ করে BTRC (বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন)।
  • ভারতে: নিয়ন্ত্রণ করে TRAIWPC

নির্ধারণের প্রক্রিয়া:

১. আবেদন ও পরীক্ষা: কোনো প্রাইভেট রেডিও বা টিভি চ্যানেল ব্যবসা শুরু করতে চাইলে সরকারের কাছে স্পেকট্রাম বা ফ্রিকোয়েন্সির আবেদন করে।

২. খালি ব্যান্ড যাচাই: বিটিআরসি টেকনিক্যাল সার্ভে করে দেখে কোনো নির্দিষ্ট রেডিও বা টিভি লাইসেন্সের জন্য প্রয়োজনীয় ফ্রিকোয়েন্সি (যেমন: রেডিওর জন্য ৮৯.২, ৯২.৪ ইত্যাদি) খালি আছে কি না।

৩. বরাদ্দ: খালি থাকলে নির্দিষ্ট নিয়ম ও শর্ত সাপেক্ষে সেই চ্যানেলকে নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য ফ্রিকোয়েন্সি লাইসেন্স দেওয়া হয়।

​৪. ফ্রিকোয়েন্সির মূল্য বা লাইসেন্স ফি

​ফ্রিকোয়েন্সি কেনা যায় না, এটি সরকারের কাছ থেকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য লিজ (Lease) বা লাইসেন্স নিতে হয়। এর মূল্য নির্ধারণের কিছু নির্দিষ্ট বিষয় রয়েছে:

​মূল্য কিসের ওপর নির্ভর করে?

  • ব্যাণ্ডউইথ বা কভারেজ এলাকা: একটি চ্যানেল কি পুরো দেশে সম্প্রচার করবে নাকি শুধু একটি নির্দিষ্ট শহরে? (সারাদেশের ফ্রিকোয়েন্সির দাম অনেক বেশি)।
  • ডিমান্ড ও প্রতিযোগিতা: জনপ্রিয় ব্যান্ড বা ফ্রিকোয়েন্সির চাহিদা বেশি থাকলে দাম বাড়ে।

​আয়ের ধরন বা খরচের খাত:

​১. এককালীন ফি (Initial License Fee): ফ্রিকোয়েন্সি বরাদ্দ পাওয়ার সময় এককালীন একটি বড় অঙ্কের ফি দিতে হয় (যা কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে)।

২. বার্ষিক স্পেকট্রাম ফি (Annual Spectrum Fee): লাইসেন্স বজায় রাখার জন্য প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট ফি দিতে হয়।

৩. নিলাম (Auction Process): অনেক দেশে (বিশেষ করে টেলিকম ও টিভি ফ্রিকোয়েন্সির ক্ষেত্রে) উন্মুক্ত নিলামের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি দরদাতাকে ফ্রিকোয়েন্সি দেওয়া হয়।


​ফ্রিকোয়েন্সি হলো বাতাসে সিগন্যাল পাঠানোর অদৃশ্য সড়ক বা লেন। ইন্টারফেয়ারেন্স এড়াতে সরকারি সংস্থা (যেমন: BTRC) এই লেনগুলোকে আলাদা আলাদা চ্যানেলের নামে বরাদ্দ দেয় এবং এর বিনিময়ে নির্ধারিত রাজস্ব বা স্পেকট্রাম ফি গ্রহণ করে।