ISO (International Organization for Standardization) প্রতিষ্ঠানটি কিভাবে গঠিত এবং কীভাবে তারা তাদের কার্যক্রম চালায়
ISO (International Organization for Standardization) বা আন্তর্জাতিক মান সংস্থা হলো বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন পণ্য, সেবা এবং প্রযুক্তির একরূপ ও উচ্চমান নিশ্চিত করার জন্য গঠিত একটি আন্তর্জাতিক অলাভজনক সংস্থা।
সংস্থাটি কীভাবে গঠিত হয়েছে এবং কীভাবে তাদের যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনা করে, তার বিস্তারিত বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:
১. ISO কীভাবে গঠিত?
- প্রতিষ্ঠার পটভূমি: ১৯৪৬ সালে লন্ডনের 'ইনস্টিটিউশন অব সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্স'-এ ২৫টি দেশের প্রতিনিধিরা একত্রিত হয়ে আন্তর্জাতিকভাবে পণ্যের মান নির্ধারণকারী একটি সংস্থা তৈরির সিদ্ধান্ত নেন। এর ফলে ১৯৪৭ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে ISO যাত্রা শুরু করে।
- সদর দপ্তর: সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় এর মূল কার্যালয় (Central Secretariat) অবস্থিত।
-
সদস্য কাঠামো: ISO কোনো সরকারি সংস্থা নয়, আবার পুরোপুরি ব্যক্তি মালিকানাধীনও নয়। এটি একটি স্বাধীন ও বেসরকারি সংস্থা।
- বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জাতীয় মান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা (National Standards Bodies) ISO-এর সদস্য হয়।
- উদাহরণস্বরূপ: বাংলাদেশে BSTI (বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন), ভারতে BIS, এবং যুক্তরাষ্ট্রে ANSI নিজ নিজ দেশের প্রতিনিধি হিসেবে ISO-এর সদস্য।
- বর্তমানে বিশ্বের ১৬০টিরও বেশি দেশ ISO-এর সদস্য।
২. সদস্যদের প্রকারভেদ
ISO-এর সদস্যপদ মূলত ৩টি শ্রেণিতে বিভক্ত:
- মেম্বার বডি (Member Bodies): এরা পূর্ণাঙ্গ সদস্য। প্রতিটি দেশ থেকে কেবল একটি সংস্থা এই প্রতিনিধিত্ব পায়। এদের ভোট দেওয়ার এবং মান নির্ধারণে সরাসরি অংশ নেওয়ার অধিকার থাকে। (যেমন: BSTI)
- কসপন্ডেন্ট মেম্বার (Correspondent Members): যেসব দেশের নিজস্ব মান নির্ধারণী সংস্থা পূর্ণাঙ্গভাবে গড়ে ওঠেনি, তারা এই সদস্যপদ নেয়। এরা মিটিংয়ে উপস্থিত থাকতে পারে, তবে ভোট দেওয়ার অধিকার থাকে না।
- সাবস্ক্রাইবার মেম্বার (Subscriber Members): ছোট অর্থনীতির দেশগুলো মূলত তথ্যের হালনাগাদ পেতে এই সদস্যপদ গ্রহণ করে।
৩. কীভাবে কার্যক্রম পরিচালিত হয়?
ISO-এর দৈনন্দিন এবং নীতিগত কার্যক্রম পরিচালনা করার জন্য একটি নির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনা কাঠামো রয়েছে:
- জেনারেল অ্যাসেম্বলি (General Assembly): সব সদস্য দেশের প্রতিনিধিদের নিয়ে তৈরি এই সভা বছরে একবার বসে। এটি সংস্থার মূল নীতি নির্ধারণ করে।
- কাউন্সিল (Council): ২০টি সদস্য দেশের প্রতিনিধি নিয়ে গঠিত এই কাউন্সিল বছরে তিনবার বৈঠক করে এবং প্রশাসনিক ও বাজেট সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেয়।
- টেকনিক্যাল ম্যানেজমেন্ট বোর্ড (TMB): মান (Standard) তৈরির পুরো কারিগরি প্রক্রিয়াটি এই বোর্ড তদারকি করে।
৪. নতুন ISO মান (Standard) কীভাবে তৈরি হয়?
ISO নিজে একা বসে কোনো মান বা নিয়ম তৈরি করে না। একটি মান তৈরি করতে নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করা হয়:
- চাহিদা চিহ্নিতকরণ: বাজার, শিল্পখাত বা কোনো নির্দিষ্ট দেশের পক্ষ থেকে যখন কোনো নতুন বিষয়ের মান নির্ধারণের প্রস্তাব আসে, তখন কাজ শুরু হয়।
- টেকনিক্যাল কমিটি (TC) গঠন: বিষয়টি যে খাতের (যেমন: খাদ্য, আইটি, পরিবেশ), সেই খাতের বিশ্বমানের বিশেষজ্ঞ, প্রকৌশলী ও গবেষকদের নিয়ে টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করা হয়।
- খসড়া তৈরি (Drafting): কমিটি পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে একটি প্রাথমিক খসড়া প্রস্তুত করে।
- ভোটাভুটি ও সম্মতি: খসড়াটি সব সদস্য দেশের কাছে পাঠানো হয়। সদস্য সংস্থাগুলো তা পর্যালোচনা করে ভোট দেয়। সব সদস্যের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ (৬৬%) সমর্থন এবং ইতিবাচক মতামত পেলে এটি চূড়ান্ত অনুমোদন পায়।
- প্রকাশনা: অনুমোদন পাওয়ার পর তা আন্তর্জাতিক মান (ISO Standard) হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয় (যেমন: ISO 9001, ISO 27001)।
৫. আয়ের উৎস
ISO তাদের কার্যক্রম পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচ মেটায় প্রধানত দুটি উপায়ে:
- সদস্য দেশগুলোর জাতীয় মান সংস্থা থেকে প্রাপ্ত বার্ষিক মেম্বারশিপ ফি।
- তৈরি করা আন্তর্জাতিক মান সংক্রান্ত ডকুমেন্ট ও গাইডবুক বিক্রি থেকে অর্জিত অর্থ।
ISO কোনো পণ্য বা প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি গিয়ে সার্টিফিকেট দেয় না। তারা শুধু মান (Standards) তৈরি করে। কোনো কোম্পানি সেই মান মেনে চলছে কি না, তা যাচাই করে সার্টিফাই করার কাজ করে বিভিন্ন তৃতীয় পক্ষ বা অনুমোদিত অডিট এজেন্সি।
